রবিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

মদীনার সনদ

 

মদীনার সনদ

মদীনার সংখ্যাগরিষ্ঠ আউস ও খাযরাজ নেতাগণ আগেই ইসলাম কবুল করায় এবং আউস ও খাযরাজ দুই প্রধান গোত্রের আমন্ত্রণ থাকায় তাদের সাথে সন্ধিচুক্তির কোন প্রশ্নই ছিল না। খাযরাজ গোত্রের আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই নেতৃত্বের অভিলাষী থাকলেও গোত্রের সংখ্যাগুরু মুসলমানদের বিরুদ্ধে গিয়ে প্রকাশ্যে কিছু করার ক্ষমতা তার ছিল না। বদর যুদ্ধের পর সে এবং তার অনুসারীরা প্রকাশ্যে ইসলাম কবুল করে। তবে সেসময় মদীনার সংখ্যালঘু ইহূদী সম্প্রদায় মুসলমানদের নবতর জীবনধারার প্রতি এবং বিশেষভাবে রাসূল (সাঃ)-এর প্রতি ঈর্ষান্বিত থাকলেও অতি ধূর্ত হওয়ার কারণে প্রকাশ্য বিরোধিতায় লিপ্ত হয়নি। সমস্যা ছিল কেবল কুরায়েশদের নিয়ে। তারা পত্র প্রেরণ ও অন্যান্য অপতৎপরতার মাধ্যমে মুনাফিক ও ইহূদীদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে রাসূল (সাঃ) ও তার সাথীদেরকে মদীনা থেকে বহিষ্কারের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে থাকে। একাজে তারা যাতে সফল না হয় সেজন্য রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সর্বপ্রথম মদীনার পার্শ্ববর্তী এলাকার লোকদের সাথে সহযোগিতা চুক্তি সম্পাদনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।
সেকারণ তিনি পার্শ্ববর্তী নিকট ও দূরের এলাকাসমূহের বিভিন্ন গোত্রের সাথে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেন। যেমন, (১) ২য় হিজরীর ছফর মাসে মদীনা হতে ২৯ মাইল দূরবর্তী ওয়াদ্দান (ودَّان) এলাকায় এক অভিযানে গেলে রাসূল (সাঃ) সেখানকার বনু যামরাহ(بَنُو ضَمْرَة) গোত্রের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করেন। (২) অতঃপর ২য় হিজরীর রবীউল আউয়াল মাসে বুওয়াত্ব (بُواط) এলাকায় এক অভিযানে গিয়ে রাসূল (সাঃ) তাদের সাথেও সন্ধিচুক্তি করেন। (৩) একই বছরের জুমাদাল আখেরাহ মাসে ইয়াম্বু‘ ও মদীনার মধ্যবর্তী যুল-‘উশায়রা(ذُو الْعُشَيْرَة) এলাকায় গিয়ে তিনি বনু মুদলিজ(بَنُو مُدْلِج) গোত্রের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। এভাবে রাসূল (সাঃ) চেয়েছিলেন, যেন যুদ্ধাশংকা দূর হয় এবং সর্বত্র শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু এসময় মদীনায় ইহূদী চক্রান্ত চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। যার নেতৃত্বে ছিল তাদের ধনশালী নেতা ও ব্যঙ্গ কবি কা‘ব বিন আশরাফ। রাসূল (সাঃ), সাহাবায়ে কেরাম ও তাঁদের স্ত্রীদের নিয়ে কটূক্তি করাই ছিল তার বদস্বভাব।
এ বিষয়ে সহীহ সনদে কা‘ব বিন মালেক আনছারী (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, ইহূদী নেতা কা‘ব বিন আশরাফ রাসূল (সাঃ)-এর বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ কবিতা বলত এবং কাফের কুরায়েশদেরকে তাঁর বিরুদ্ধে উস্কানী দিত। অতঃপর রাসূল (সাঃ) যখন মদীনায় আসেন, তখন এখানে মিশ্রিত বাসিন্দারা ছিল। তাদের মধ্যে মুসলমানেরা ছিল। মুশরিকরা ছিল, যারা মূর্তিপূজা করত। ইহূদীরা ছিল, যারা রাসূল (সাঃ) ও তাঁর সাহাবীদের কষ্ট দিত। এমতাবস্থায় আল্লাহ স্বীয় নবীকে ছবর ও মার্জনার আদেশ দিয়ে আয়াত নাযিল করেন,لَتُبْلَوُنَّ فِي أَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ وَلَتَسْمَعُنَّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَمِنَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا أَذًى كَثِيرًا وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ ‘অবশ্যই তোমরা পরীক্ষায় পতিত হবে তোমাদের ধন-সম্পদে ও তোমাদের নিজেদের জীবনে। আর তোমরা অবশ্যই শুনবে তোমাদের পূর্ববর্তী আহলে কিতাব ও মুশরিকদের কাছ থেকে অনেক কষ্টদায়ক কথা। যদি তোমরা তাতে ধৈর্য ধারণ কর এবং আল্লাহভীরুতা অবলম্বন কর, তবে সেটাই হবে দৃঢ় সংকল্পের কাজ’ (আলে ইমরান ৩/১৮৬)। অতঃপর যখন কা‘ব বিন আশরাফ রাসূল (সাঃ)-কে কষ্টদানে বিরত থাকতে অস্বীকার করল, তখন রাসূল (সাঃ) আউস নেতা সা‘দ বিন মু‘আযকে তার বিরুদ্ধে একদল লোক পাঠাতে বললেন, যেন তারা তাকে হত্যা করে। তখন তিনি মুহাম্মাদ বিন মাসলামাহকে পাঠালেন। অতঃপর তিনি (রাবী) তার হত্যার কাহিনী বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, এ ঘটনায় ইহূদী ও মুশরিকরা ভীত হয়ে পড়ে। ফলে পরদিন তারা রাসূল (সাঃ)-এর নিকটে হাযির হয়ে বলল, আমাদের নেতাকে রাতের বেলায় তার বাড়ীতে গিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তখন রাসূল (সাঃ) তাদেরকে তার ব্যঙ্গ কবিতার কথা বললেন। অতঃপর তিনি তাদের বললেন তাঁর ও তাদের মধ্যে একটা লিখিত চুক্তি সম্পাদন করতে। যাতে তারা যেসব গালি ও কষ্ট দেয়, তা থেকে বিরত হয়। অতঃপর নবী (সাঃ) তাঁর ও তাদের মধ্যে এবং মুসলমানদের মধ্যে একটা চুক্তিনামা (صَحِيفَة) লিখে দিলেন’ (আবুদাঊদ হা/৩০০০)।

অত্র হাদীছ দৃষ্টে প্রতীয়মান হয় যে, চুক্তি লিখনের এই বিষয়টি হিজরতের পরেই নয়, বরং ৩য় হিজরীর রবীউল আউয়াল মাসে কা‘ব বিন আশরাফের হত্যাকান্ডের পরে হয়েছিল। যা অধিকাংশ জীবনীকার ও ইতিহাসবিদগণের বক্তব্যের বিরোধী। যেমন মুবারকপুরী বলেন, ‘মদীনায় হিজরতের পরপরই নবগঠিত ইসলামী সমাজের বিধি-বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য’ রাসূল (সাঃ) মদীনার সনদ রচনা করেন (আর-রাহীক্ব ১৯২ পৃঃ)। অথচ বিষয়টি সহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত নয়। নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক বর্ণনার চাইতে সহীহ হাদীছের গুরুত্ব সর্বাধিক।
জীবনীকারগণ উপরোক্ত সহীহ হাদীছের জওয়াবে বলেন, এটি ‘১ম চুক্তির নবায়ন’ (تَجْدِيْدٌ لِلْمَوْثِقِ الْأَوَّلِ) হতে পারে।[সীরাহ সহীহাহ ১/২৭৮ পৃঃ; মা শা-‘আ ৯৯ পৃঃ] চুক্তিটি বিস্তারিতভাবে এসেছে ইবনু ইসহাকের বর্ণনায় সনদবিহীনভাবে (ইবনু হিশাম ১/৫০১-০৪ পৃঃ)। শায়খ আলবানী বলেন, এভাবে ইবনু ইসহাক সনদ ছাড়াই এটি বর্ণনা করেছেন। অতএব বর্ণনাটি মু‘যাল (যঈফ)। ইবনুল ক্বাইয়িম (৬৯১-৭৫১ হি.) তাঁর বিখ্যাত জীবনীগ্রন্থ যাদুল মা‘আদে কেবল এটুকু লিখেছেন, وَوَادَعَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ بِالْمَدِينَةِ مِنَ الْيَهُودِ وَكَتَبَ بَيْنَهُ وَبَيْنَهُمْ كِتَابًا ‘রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মদীনায় অবস্থানকারী ইহূদীদের সাথে চুক্তি করেন এবং তিনি তাঁর ও তাদের মধ্যে একটি দলীল লিপিবদ্ধ করেন’ (যাদুল মা‘আদ ৩/৫৮ পৃঃ)। এতটুকু ব্যতীত আগে-পিছে কোন বক্তব্য বা মন্তব্য নেই। ইবনু কাছীর (৭০১-৭৪ হি.) কোনরূপ মন্তব্য ছাড়াই ইবনু ইসহাকের বর্ণনাটি উদ্ধৃত করেছেন (আল-বিদায়াহ ৩/২২৪-২৬)। যেটি তাঁর স্বভাব বিরোধী। এতদ্ব্যতীত ইমাম আহমাদ (হা/২৪৪৩), ইবনু আবী খায়ছামাহ, আবু ওবায়েদ ক্বাসেম বিন সাল্লাম, বায়হাক্বী, ইবনু আবী হাতেম, ইবনু হাযম প্রমুখ যারাই উক্ত চুক্তি সংক্ষেপে বা বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করেছেন, কোনটাই বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত নয়। সম্ভবতঃ একারণেই বিখ্যাত মুহাদ্দিছ ও ঐতিহাসিক ইমাম যাহাবী (৬৭৩-৭৪৮ হি.) তাঁর ‘তারীখুল ইসলাম’ গ্রন্থে এবং ইমাম নববী (৬৩১-৬৭৬ হি.) স্বীয় ‘তাহযীবুল আসমা ওয়াল লুগাত’ গ্রন্থে বিভিন্ন হিজরী সনে ‘প্রসিদ্ধ ঘটনাবলী’র তালিকায় এটি আনেননি। এ চুক্তিনামা সঠিক হলে তিনি তা ১ম হিজরী সনের ঘটনাবলীর মধ্যে অবশ্যই আনতেন। অতএব ঘটনাটি প্রসিদ্ধ হলেও বিশুদ্ধ নয় (মা শা-‘আ ৯১-৯৮ পৃঃ)।
সহীহ হাদীছের বর্ণনা অনুযায়ী কেবল এটুকুই পাওয়া যায় যে, ৩য় হিজরী সনে তিনি ইহূদীদের ও অন্যান্যদের মধ্যে একটা ‘চুক্তিনামা’ লিখে দিয়েছিলেন। সেটিই ‘মদীনার সনদ’ নামে খ্যাত। তবে সেখানে তখনকার সময়ে প্রয়োজনীয় সবকিছুই লেখা ছিল বলে ধরে নেওয়া যায়। তাতে কি লেখা ছিল, তা জানা যায় না।
মদীনার সনদের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে ড. আকরাম যিয়া উমারী (জন্ম: ১৯৪২ খৃ.) বলেন, আমার নিকট অগ্রগণ্য এই যে, চুক্তিনামা ছিল দু’টি। প্রথমটি ছিল ইহূদীদের সাথে রাসূল (সাঃ)-এর মদীনায় আগমনের পর এবং দ্বিতীয়টি ছিল মুহাজির ও আনছারদের মাঝে বদর যুদ্ধের পর’। কিন্তু ঐতিহাসিকগণ দু’টি চুক্তি একত্রিত করেছেন’ (সীরাহ সহীহাহ ১/২৮১)।
আকরাম যিয়া উমারী যে উক্ত চুক্তিটিকে দুই সময়ে দুইভাগে ভাগ করেছেন, তার পিছনে কোন প্রমাণ নেই। কেননা তাঁর ও সকল জীবনীকারের এ বিষয়ে বর্ণনার ভিত্তি হল ইবনু ইসহাক (৮৫-১৫১ হি.)-এর সনদবিহীন বর্ণনা। যা তিনি একবারেই এবং একসাথে বর্ণনা করেছেন (ইবনু হিশাম ১/৫০১-০৪)। আকরাম যিয়া উক্ত দীর্ঘ বর্ণনার বাক্যগুলিকে ৪৭টি ধারায় পরিণত করেছেন মাত্র (সীরাহ সহীহাহ ১/২৮২-৮৫)।
তিনি হাদীছ ও ইতিহাসের বর্ণনাগুলির সমন্বয় করতে গিয়ে বলেছেন, উভয়ের মধ্যে হাদীছের বর্ণনা ইতিহাসের বর্ণনাসমূহের চাইতে অধিক শক্তিশালী। কিন্তু সেজন্য ইতিহাসের বর্ণনাসমূহকে নাকচ করার কোন কারণ নেই। কেননা কা‘ব বিন আশরাফের হত্যার পরে আগের চুক্তিটির তাকীদ কিংবা নবায়ন হিসাবে পুনরায় চুক্তি করায় কোন বাধা নেই’ (সীরাহ সহীহাহ ১/২৭৮)।

বস্ত্ততঃ এগুলি স্রেফ ধারণা ও কল্পনা মাত্র। অতএব আমরা সহীহ হাদীছের আলোকে কেবল এটুকুই বলব যে, ইহূদীরা তাদের নেতা কা‘ব বিন আশরাফের হত্যাকান্ডে ভীত হয়েই চুক্তিতে রাজি হয়েছিল এবং যা ছিল ৩য় হিজরীর রবীউল আউয়াল মাসের পরের ঘটনা। নিঃসন্দেহে সে চুক্তিটি ছিল পারস্পরিক সন্ধিচুক্তি। কিন্তু চুক্তিটি কি ছিল, তার ভাষা কি ছিল, সেখানে কয়টি ধারা ছিল, কিছুই সঠিকভাবে বলার উপায় নেই।[1]
পার্শ্ববর্তী নিকট ও দূরের গোত্রসমূহের সাথে সন্ধিচুক্তিসমূহ সম্পাদনের পর ইহূদীদের সাথে অত্র চুক্তি সম্পাদনের ফলে প্রকৃত প্রস্তাবে ইসলামী খিলাফতের ভিত্তি স্থাপিত হয় এবং মদীনা তার রাজধানীতে পরিণত হয়। অতএব বলা চলে যে, মদীনার সনদ ছিল একটি আন্তঃধর্মীয় ও আন্তঃসাম্প্রদায়িক চুক্তি, যার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ স্বার্থে ও একক লক্ষ্যে একটি উম্মাহ বা জাতি গঠিত হয়। আধুনিক পরিভাষায় যাকে ‘রাষ্ট্র’ বলা হয়। এই সনদ ছিল আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার সর্বপ্রথম ভিত্তি স্বরূপ।


শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ :
━━━━━━━━━━━━
(১) বংশীয়, গোত্রীয় এবং ধর্মীয় পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রেখেও বৃহত্তর ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রীয় খেলাফত প্রতিষ্ঠা করা যায়, রাসূল (সাঃ)-এর মাদানী জীবনের কর্মনীতি তার বাস্তব সাক্ষী।
(২) ইসলামী বিধানের অনুসরণের মাধ্যমেই কেবল বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব, মদীনার সনদ তার বাস্তব দলীল।




[1]. পাঠকদের জ্ঞাতার্থে আমরা মুহাম্মাদ বিন ইসহাক-এর ধারাবিহীন ও সনদবিহীনভাবে বর্ণিত চুক্তিনামাটি ড. আকরাম যিয়াকৃত ধারা অনুযায়ী বিন্যস্ত করে অনুবাদসহ উল্লেখ করলাম। বর্ণনার মধ্যে ভুলক্রমে একটি বাক্য দু’বার আনা সত্ত্বেও তাকে ২৪ ও ৩৮ দু’টি ধারা হিসাবে গণ্য করা হয়েছে (সীরাহ সহীহাহ ১/২৮৪)। ধারা বিন্যাসে তিনি কিছু আগ-পিছ করেছেন। আমরা ইবনু হিশামের বর্ণনার অনুসরণ করেছি এবং একই বক্তব্য বারবার থাকায় আমরা মতনে ও অনুবাদে ৪-১১ ধারাগুলি সংক্ষিপ্ত করেছি।- قَالَ ابْنُ إسْحَاقَ: وَكَتَبَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كِتَابًا بَيْنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ، وَادَعَ فِيهِ يَهُودَ وَعَاهَدَهُمْ، وَأَقَرَّهُمْ عَلَى دِينِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ، وَشَرَطَ لَهُمْ، وَاشْتَرَطَ عَلَيْهِمْ: (১) এটি লিখিত হচ্ছে নবী মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর পক্ষ হতে মুমিন ও মুসলমানদের মধ্যে যারা কুরায়শী ও ইয়াছরেবী এবং তাদের অনুগামী, যারা তাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে জিহাদে অংশগ্রহণ করে থাকে। (২) এরা অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র একটি জাতি হিসাবে গণ্য হবে। (৩) কুরায়েশ মুহাজিরগণ তাদের নিজ অবস্থায় থাকবে। তারা তাদের বন্দী বিনিময়ে মুমিনদের মাঝে ন্যায়সঙ্গতভাবে ফিদইয়া দিবে। একইভাবে (৪) বনু ‘আওফ, (৫) বনু সা‘এদাহ, (৬) বনুল হারেছ, (৭) বনু জুশাম, (৮) বনু নাজ্জার, (৯) বনু ‘আমর বিন ‘আওফ, (১০) বনু নাবীত, (১১) বনু আউস সবাই স্ব স্ব পূর্বের অবস্থায় থাকবে এবং তাদের স্ব স্ব গোত্র ও শাখাসমূহ বন্দী বিনিময়ে মুমিনদের মাঝে ন্যায়সঙ্গতভাবে ফিদইয়া দিবে। (১২) মুমিনগণ তাদের মধ্যকার কোন ঋণগ্রস্ত বা অভাবগ্রস্ত পরিবারকে ছেড়ে যাবে না, ন্যায়সঙ্গতভাবে তাকে ফিদইয়া বা রক্তমূল্য না দেয়া পর্যন্ত। কোন মুমিন কোন মুমিনের গোলামের সাথে কোনরূপ চুক্তি করবে না। (১৩) মুমিন-মুত্তাক্বীগণ তাদের মধ্যে কেউ বিদ্রোহ করলে বা বড় কোন যুলুম করলে, পাপ করলে, শত্রুতা করলে কিংবা মুমিনদের মধ্যে বিশৃংখলা সৃষ্টি করলে তার বিরোধিতা করবে এবং সকলে তার বিরুদ্ধে একত্রিত হবে। যদিও ঐ ব্যক্তি তাদের কোন একজনের সন্তান হয়। (১৪) কোন মুমিন কাফিরের বিনিময়ে কোন মুমিনকে হত্যা করবে না এবং মুমিনের বিরুদ্ধে কোন কাফিরকে সাহায্য করবে না। (১৫) আল্লাহর যিম্মা এক। তারা তাদের অধীনস্তদের আশ্রয় দিবে। আর মুমিনগণ একে অপরের বন্ধু অন্যদের থেকে। (১৬) যেসব ইহূদী আমাদের অনুসারী হবে তাদের জন্য থাকবে সাহায্য ও উত্তম আচরণ। তারা অত্যাচারিত হবে না এবং তাদের উপরে কেউ প্রতিশোধ নিতে পারবে না। (১৭) মুমিনদের সন্ধিচুক্তি একই। কোন মুমিন আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধের সময় মুমিন ব্যতীত অন্যের সাথে সন্ধি করবে না, নিজেদের মধ্যে সমভাবে বা ন্যায়সঙ্গতভাবে ব্যতীত। (১৮) প্রত্যেক যুদ্ধ যা আমাদের সাথে হবে, সেখানে একে অপরের পিছে আসবে। (১৯) মুমিনগণ একে অপরকে রক্ষা করবে, যখন আল্লাহর রাস্তায় তাদের রক্ত প্রবাহিত হবে। (২০) মুমিন-মুত্তাক্বীগণ সুন্দর ও সরল পথে থাকবে। কোন মুশরিক কোন কুরায়েশ-এর জান ও মালের হেফাযত করবে না এবং মুমিনের বিরুদ্ধে বাধা হবে না। (২১) যদি কেউ কোন মুমিনকে বিনা দোষে হত্যা করে এবং তার প্রমাণ থাকে, তাহলে সে তার বদলা নেবে। তবে যদি নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীগণ ক্ষমা করে দেয় (রক্ত মূল্যের বিনিময়ে)। সকল মুমিন এ চুক্তির উপরে থাকবে। এর উপরে দৃঢ় থাকা ব্যতীত তাদের জন্য অন্য কিছু সিদ্ধ হবে না। (২২) আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী যে মুমিন এই চুক্তিতে স্বীকৃত হবে, তার জন্য সিদ্ধ হবে না কোন বিদ‘আতীকে সাহায্য করা বা আশ্রয় দেওয়া। যে ব্যক্তি তাকে সাহায্য করবে বা আশ্রয় দিবে, কিয়ামতের দিন তার উপরে আল্লাহর লা‘নত ও গজব থাকবে। তার থেকে কোনরূপ বিনিময় কবুল করা হবে না। (২৩) যখনই তোমরা এতে মতভেদ করবে, তখনই সেটা আল্লাহ ও মুহাম্মাদের দিকে ফিরে যাবে। (২৪) ইহূদীরা মুমিনদের সাথে খরচ বহন করবে, যতক্ষণ তারা একত্রে যুদ্ধ করবে। (২৫) বনু ‘আওফের ইহূদীগণ মুসলমানদের সাথে একই জাতিরূপে গণ্য হবে। ইহূদীদের জন্য তাদের দ্বীন এবং মুসলমানদের জন্য তাদের দ্বীন। এটা তাদের দাস-দাসীদের জন্য এবং তাদের নিজেদের জন্য সমভাবে গণ্য হবে। একইভাবে বনু ‘আওফ ব্যতীত অন্য ইহূদীদের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য হবে। তবে যে যুলুম করবে ও পাপ করবে, সে নিজেকে ও তার পরিবারকে ছাড়া কাউকে ধ্বংস করবে না। (২৬) আর বনু নাজ্জার, (২৭) বনুল হারেছ, (২৮) বনু সা‘এদাহ, (২৯) বনু জুশাম, (৩০) বনুল আউস, (৩১) বনু ছা‘লাবাহর ইহূদীদের জন্য ঐরূপ চুক্তি যেরূপ থাকবে বনু ‘আওফের ইহূদীদের জন্য। তবে যে ব্যক্তি যুলুম করবে ও পাপ করবে, সে নিজেকে ও নিজের পরিবারকে ছাড়া কাউকে ধ্বংস করবে না। (৩২) ছা‘লাবাহর জাফনাহ গোত্রটি তাদের মতই গণ্য হবে। (৩৩) বনু শুত্বাঈবাহর জন্য বনু ‘আওফের ইহূদীদের মতই চুক্তি থাকবে। কেবল সদ্ব্যবহার থাকবে, অন্যায় নয়। (৩৪) ছা‘লাবাহর দাস-দাসীগণ তাদের মতই গণ্য হবে। (৩৫) ইহূদীদের মিত্রগণ ইহূদীদের মতই গণ্য হবে। (৩৬) মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর অনুমতি ব্যতীত তাদের কেউ বাইরে যেতে পারবে না। কোন যখমের বদলা নিতে বিরত থাকবে না। যে ব্যক্তি বাড়াবাড়ি করে, সে তার নিজের উপর ও নিজ পরিবারের উপর বাড়াবাড়ি করে। তবে যে ব্যক্তি অত্যাচারিত হয়, আল্লাহ তার ব্যাপারে খুশী থাকেন। (৩৭) ইহূদীদের উপর তাদের ব্যয় এবং মুসলমানদের উপর তাদের ব্যয়। যারা এই চুক্তিকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, তাদের বিরুদ্ধে তারা পরস্পরকে সাহায্য করবে। তারা পরস্পরের প্রতি সুধারণা রাখবে, উপদেশ দিবে ও সদাচরণ করবে। অন্যায় করবে না। মিত্রের অন্যায়ের কারণে ব্যক্তি দায়ী হবে না। মযলূমকে সাহায্য করা হবে। (৩৮-পুনরুক্ত) ইহূদীরা মুমিনদের সাথে খরচ বহন করবে, যতক্ষণ তারা একত্রে যুদ্ধ করবে (এটিতে ধারা ২৪-এর পুনরুক্তি হয়েছে)। (৩৯) চুক্তিভুক্ত সকলের জন্য ইয়াছরিবের অভ্যন্তরভাগ হারাম অর্থাৎ নিরাপদ এলাকা হিসাবে গণ্য হবে। (৪০) প্রতিবেশীগণ চুক্তিবদ্ধ পক্ষের ন্যায় গণ্য হবে। যদি সে ক্ষতিকারী ও অন্যায়কারী না হয়। (৪১) কোন নারীকে আশ্রয় দেওয়া যাবে না, তার পরিবারের অনুমতি ব্যতীত। (৪২) চুক্তিবদ্ধ পক্ষগুলোর মধ্যে কোন সমস্যা ও ঝগড়ার সৃষ্টি হলে এবং তাতে বিপর্যয়ের আশংকা দেখা দিলে তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর নিকটে পেশ করা হবে। এই চুক্তিনামায় যা আছে, আল্লাহ তার উপর সর্বাধিক সতর্কতা ও সন্তুষ্টিতে আছেন। (৪৩) কুরায়েশ ও তাদের সহায়তাকারীদের আশ্রয় দেওয়া হবে না। (৪৪) ইয়াছরিবের উপরে কেউ হামলা চালালে সম্মিলিতভাবে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। (৪৫) যখন তারা কোন সন্ধির দিকে আহুত হবে, যেখানে তারা পরস্পরে মীমাংসা করবে ও নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য তা কবুল করবে, তারা সেটাতে সাড়া দিবে। মুমিনদের উপর এটা প্রযোজ্য হবে। তবে যারা ধর্মের কারণে যুদ্ধ করে, তাদের উপর নয়। প্রত্যেকের জন্য তার নিজ পক্ষের অংশ নির্ধারিত হবে। (৪৬) আউসের (মিত্র) ইহূদীদের নিজেদের ও তাদের দাস-দাসীদের উপর অনুরূপ প্রযোজ্য হবে, যেরূপ অত্র চুক্তিকারীদের উপর প্রযোজ্য হবে। (আর তা হল) স্রেফ সদাচরণ এই চুক্তিকারীদের পক্ষ হতে। ইবনু ইসহাক বলেন, সদাচরণ সেটাই যাতে পাপ নেই। অর্জনকারী কেবল নিজের জন্যই তা অর্জন করে থাকে। এই চুক্তিনামায় যা আছে, আল্লাহ তার উপর সর্বাধিক সত্যতা ও সন্তুষ্টিতে আছেন। (৪৭) কোন অত্যাচারী ও পাপীর জন্য এ চুক্তিনামা কোনরূপ সহায়ক হবে না। যে ব্যক্তি বের হয়ে যাবে, সে নিরাপদ থাকবে এবং যে ব্যক্তি বসে থাকবে, সে ও মদীনায় নিরাপদ থাকবে। ঐ ব্যক্তি ব্যতীত যে যুলুম ও অন্যায় করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ ঐ ব্যক্তির সাথী, যে সদাচরণ করে ও আল্লাহভীরুতা অবলম্বন করে। আর মুহাম্মাদ হলেন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম’। (ইবনু হিশাম ১/৫০১-০৪; সীরাহ নববীইয়াহ সহীহাহ ১/২৮২-৮৫; আল- বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৩/২২৪ পৃঃ)।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

RFL Jim & Jolly Smile Baby Walker Cyan Blue & White 939294

 🔥 আজকের Best Deal! এই wireless earbuds এখন special discount এ 🛒 RFL Jim & Jolly Smile Baby Walker Cyan Blue & White 939294 ✅ ভালো...